তিয়ান পুতুই

লেখক এবং এক্টিভিস্ট।

যৌন অবদমন নাকি নিয়ন্ত্রণ?

ধর্মীয় বিধান মানুষকে সংবরণ (abstinence) শেখায়, সংবরণ এর সবচে বড় সমস্যা হলো এটা মানুষের মৌলিক আর বায়োলজিক্যাল চাহিদার সাথে অস্বাভাবিক ভাবে বিসদৃশ (abnormally antithetical)। মানুষ তার চাহিদা পূরণ করবে যে কোন মূল্যেই এবং এই চাহিদা পূরণের জন্য তারা তখন অজ্ঞ (uninformed)  সিদ্ধান্ত নেয়। যতবেশী অবদমন, চাহিদা পূরণের চেষ্টা তত বেশী কুশ্রী আর সহিংস হয়। যার ফলাফল হয় ভয়াবহ, সেটা যে ক্ষেত্রেই অবদমন হোক না কেনো। "নিষিদ্ধ" শব্দে আসলে কোন আচার, প্রথা বা নিয়মের কবর হয় না, বরং তাকে কুখ্যাতিদানের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সংগোপনে কেবল জনপ্রিয়ই না বরং পূজনীয় করে রাখা হয়।


এরচে বরং নিয়ন্ত্রণ শেখানো ভালো। নিয়ন্ত্রণ এর সাথে সংবরণ এর পার্থক্য এখানেই যে, নিয়ন্ত্রণ শিখলে কোনো আচারে দৈবত্য আরোপিত হয় না, সেগুলাকে "বিশেষ কিছু" না ভেবে বরং সাধারণ ও স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া যায়, এবং সে সংক্রান্ত তথ্য বা জ্ঞান আহরণে যেহেতু কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বাঁধা থাকে না, তাতে ইনফর্মড সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। পরিশেষে নিয়ন্ত্রণের প্র‍্যাক্টিস থাকলে নিজের জানের উপর বুলডোজার চালানোর প্রয়োজন পড়ে না, যে কোনো অভিজ্ঞতার সাথে আস্তে ধীরে ভদ্রভাবে পরিচিত হওয়ায় তো কোন বাঁধা থাকেনা। 


উদাহরণ স্বরূপ ধরা যায়, প্যারাফিলিক যৌন আচার বিডিএসএমের কিংকি কিংকি প্র‍্যাক্টিসকে (এই উদাহরণটা দিতে ইচ্ছা করছিলো না, কিন্তু দিহানের ঘটনায় এটা প্রাসঙ্গিক) লোকজনে "পশ্চিমা" ট্যাগ দিয়ে ভাসায় ফেলতেছে, পশ্চিমে দুই একজন বিচ্ছিন্ন "তারছিঁড়া মাথা গরম পিস্তল লোড" কিছিমের মানুষ ছাড়া এই ধরনের যৌনতার কোনো চর্চাই আসলে নাই, কেননা যৌনতা পশ্চিমে ট্যাবু না বিধায় মানুষ সেক্স এডুকেশন এবং তারই ধারাবাহিতায় সেক্সুয়াল সেল্ফ এডুকেশনের মাধ্যমে বেশীর ভাগ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জেনে যায় যে পর্নোগ্রাফি রিয়েল লাইফ এক জিনিস না। অনেকে ভাবে সেক্স এডুকেশনে 
কামাসুত্র চামুচ দিয়ে গেলায় দেয়া তা নয় বরং সেক্স এডুকেশন এর উদ্দেশ্য এইটা যে, যৌনতা সংক্রান্ত প্রশ্ন ও জ্ঞান থাকাটা স্বাভাবিক এবং অতি প্রয়োজনীয়ও বটে। এই জিনিসটা জানে না যৌনশিক্ষা বঞ্চিত বাংলাদেশের মানুষ। 


পর্নো ইন্ডাস্ট্রি যে পশ্চিমাদের দখলে তাতে দ্বিমত নাই। পর্নোগ্রাফির ক্ষতিকারক দিকের দায় তাদেরও আছে। সিগারেট এর প্যাকেটেও সতর্কীকরণ বাণী থাকে যে- ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। রেসলিং এ খেলোয়াররা খেলা শেষে বলে যে -বাসায় এটা ভুলেও অনুকরণ করা যাবে না, কিন্তু প্যারাফিলিক পর্নোগ্রাফি নির্মাতারা এই পর্যন্ত দ্বায়িত্ব নিয়ে একজন দর্শককেও বলে নাই যে, এই তীব্র রগরগে এড্রেনালিন পাম্পিং যৌনতা রিয়েল লাইফে প্র‍্যাক্টিস এর জন্য উপযুক্ত না, কিংবা পর্নোগ্রাফি একটা অসুস্থ আসক্তির কারণ। 


হুম, পর্নোগ্রাফি একটা সমস্যাই বটে, সেই সাথে বাংলা অযাচারময় চটিও আরেকটা সমস্যা। এই সমস্যাগুলার সমাধান করা আদৌ সম্ভব কিনা বা করলে কিভাবে করা যাবে সেই আরেক বিশাল আলোচনা। তবে ব্যক্তিকে শিক্ষিত করা সম্ভব, সহজেই সম্ভব। সেই শিক্ষার জন্য ধর্মীয় অবদমনকে গুরুত্ব দিলে অনিরাপদ যৌনতাকে আরও সুনিশ্চিত করা হয়। দিহান হয়তোবা জানে, এই ধরনের কিংকি কাজ স্বাভাবিক না, কিন্তু হয়তো আনুশকা জানে না।


কন্সেন্ট যে একটা সিদ্ধান্ত -এ বিষয়ে কারুর দ্বিমত আশাকরি নাই, প্রতিটা সিদ্ধান্তের জন্য ইনফরমেশন বা নলেজের গুরুত্ব অপরিসীম। অজ্ঞদের কাছে প্রেমের দোহাই দিয়ে যে অনুমতি/ সম্মতি আদায় করা হয়, ওটা কোরান শরীফে কসম কাটিয়ে গ্রামের শিক্ষাবঞ্চিত মানুষদের থেকে ভোট আদায়ের থেকে খুব একটা আলাদা না। উভয় ক্ষেত্রেই ডেমোক্রেসি ও সম্মতি ইত্যাদি নিয়ম রক্ষা হচ্ছে কিন্তু নিয়মের পেছনের উদ্দেশ্য/ হেতু রক্ষা পাচ্ছে না- কেননা তাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে সারপদার্থবিহীন। আমাদের একটা ইনফর্মড গোষ্ঠী দরকার; অবদমনে ভুগে পালিয়ে বেড়ানো মূর্খ আর ভীতুদের প্রয়োজন নাই। আমাদের নিয়ন্ত্রণ শেখা দরকার, প্যারাফিলিয়া তো একমাত্র যৌন সমস্যা না, আর যৌনতা তো বাৎসরিক প্রমোদভ্রমণের মতো ওকেশনাল কিছুও না- যৌনতা আমাদের মৌলিক জৈবিক চাহিদা। 


এটা নিয়ে সুশিক্ষা আর সচেতনতা ধর্মীয় অনুশাসন আনবে না, ধর্মীয় অনুশাসন কেবল উপরি উপরি পবিত্রতার একটা মুখোশ ধরে রাখে, পর্দার অন্তরালে শিশু ধর্ষণ, দাসী ধর্ষণ (সৌদি গৃহকর্মীদের জীবন দ্রষ্টব্য), পতিতাকে অমানবিকভাবে ব্যবহার করা, দাসী পতিতা থেকে এসটিডি বহন করে স্ত্রীতে ছড়িয়ে দেওয়া, কন্ট্রাসেপশন ব্যবহারের অভাবে টিন প্রেগন্যান্সি, এবং অনিরাপদ এবরশান সবই চলে। এছাড়া যৌনতা সংক্রান্ত লাইফস্টাইল প্রেফারেন্স- যেমন সিঙ্গেল মা বা সমকামের সমাধানও হয় না এ দিয়ে। পিতৃপরিচয়হীন সন্তানকে সামাজিক হেনস্থার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা, সামাজিক হেনস্থার শিকার (কখনো সেটা মৃত্যুতে গড়ায়) ট্রান্সজেন্ডার আর সমকামীদের অসৎভাবে গোপনে ব্যবহার/ ধর্ষণ করা এই সমস্যাগুলা ধর্ম দিয়ে সমাধান হয় না, বরং টিকায়ে রাখা হবে। আমাদের একটা যৌন নিরাপত্তা ও অধিকারের বৈশ্বিক/ সার্বজনীন সমাধান প্রয়োজন, ধর্মীয় অনুশাসন সেখানে আরেকটা সমস্যা, কোনো সমাধান না।

591 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।