সুমাইয়া অনন্যা

সুমাইয়া অনন্যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ অনার্স ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত ও এক রিসার্চ ফার্মে অ্যাসিস্ট্যান্ট রিসার্চার হিসেবে কর্মরত।

"তুমি দেবী কিংবা পতিতা"– ম্যাডোনা অ্যান্ড হোর কমপ্লেক্স ও পুরুষতন্ত্র

–ছেলেদের মত শরীর,মেয়েদের মত চালচলন!
ওকে নিয়ে বাইরে বের হতে লজ্জিত বোধ করেন না? 
–মিসেস সেন হেসে বলে উঠলো,
"আমি তো ভগবানের কাছে একটি সন্তান চেয়েছিলাম
উনি স্বয়ং আসবেন ভাবতেই পারিনি।"

ট্রান্সদের পক্ষে খুবই জনপ্রিয় এবং সুন্দর একটা কথা এইটা। আপাতদৃষ্টিতে এইটা সুন্দর হইলেও আমার কথাটা নিয়ে দ্বিমত আছে। থামেন, রাইগেন না। 

আমি কোনোভাবেই এলজিবিটি বিদ্বেষী না বরং এই নিয়ে ছোট্ট মাথায়, ছোট্ট বয়সে প্রচুর পড়ালেখা করেছি/করতেছি/ করবো যেহেতু জেন্ডার এ্যান্ড সেক্সুয়াল ইকুয়ালিটি নিয়েই কাজ করার ইচ্ছা আমার।  এবার আসি উপরের এই মহৎ লাইনটা কেনো পছন্দ না সেই বিষয়ে। 

"ম্যাডোনা এ্যান্ড হোর" নামে সাইকোলজিতে একটা টার্ম আছে।  ফ্রয়েড তার সাইকিক ইম্পোটেন্স এর বিধানে "ম্যাডোনা এ্যান্ড হোর" কমপ্লেক্স নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন। এই শব্দটি সাইকোলজিস্ট/ সাইক্রিয়াটিস্টগণ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করলেও কখনও কখনও সূক্ষ্মভাবে এর ভিন্ন অর্থ রয়েছে, রয়েছে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। 

এই টক্সিক পুরুষতন্ত্রে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেশিরভাগ পুরুষই নিজেরে সুপিরিয়র ভাবে (প্রকাশ করুক বা না করুক, সে জানুক বা না জানুক; সমাজব্যবস্থা তা তার জন্মের পর থিক্কা এই সুপ্ত বেপার ঢুকায়ে দেয় তার মাথায়) যেখানে নারীরই কোনো চিহ্ন থাকে না, সমকক্ষ হিসেবে সেখানে এলজিবিটির চ্যাপ্টার তো বাদই দিলাম। বেপারটা এমন যে লিঙ্গ প্রধানত এক প্রকারই তা হইলো পুরুষ আর তারপর অন্যান্য। 

তো সেই সমাজে শারীরিক আকর্ষণের জায়গা থিক্কা যখন পুরুষ নারীদের প্রেমে পরে, ট্রান্স নারীর প্রেমে পরে, পুরুষ হইয়াও পুরুষের প্রেমে পরে, এতে করে তার সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি চেইঞ্জ হয় ঠিকই কিন্তু পুরুষের রোলে যখন সে থাকে (তখন সে নারী হোক বা পুরুষ, গে কিংবা লেসবিয়ান) তখন ওই ছোট্ট বেলার সুপ্ত ইচ্ছা কিংবা মানসিক জটিলতা থিক্কা সেও বাদ যায় না। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই টক্সিক পুরুষতন্ত্রের কারণে যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে সুপিরিয়র ভাবা ম্যাক্স পুরুষ কিংবা পুরুষের রোলে থাকা ব্যক্তি এই মানসিক জটিলতায় ভোগে যারা তার ইনফেরিয়র ভাবা পার্টনারকে (নারী কিংবা অন্যান্য কে) হয় পবিত্র বা সতী (ম্যাডোনা বা কুমারী মেরির মতো) দেবী হিসেবে দেখে, অথবা বেশ্যা এর মতো হীন হিসেবে দেখে কিংবা অবচেতনে এটাই ধারণ করে। 

যেহেতু সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, পুরুষের নিয়মেই চলে তাই নারীরে কিছু থেইকা কিছু ভালোতেই দেবী বানায়ে ফেলে, স্বর্গীয় কিছু ভাইবা ফেলে কিংবা বেশ্যা। দেবী বানাইলে তারে পূজাও করে এবং বুঝায়, 
"দেখো তোমারে কতক্ষানি সম্মান কত্তেসি আমরা" 

একই ঘটনা ইদানীং এলজিবিটি অ্যাক্টিভিজমের ক্ষেত্রে হইতেছে, সেটা জেনে হোক বা না জেনে। 

আর এখানেই মূলত আমার সমস্যাটা। একটা মানুষরে স্রেফ মানুষ হিসেবে দেখতেছি না আমরা, আর পাঁচ জনের মতো মানুষ! মানুষের জায়গাটা মূলত মিডেল পয়েন্টে। সেই পয়েন্টে বইসা আমরা হয় তারে/ তাদেরকে দেবী বানায়া তুঙ্গে উঠায়ে ফেলতেছি নয়তো পা এর তলায় পিষতেছি। 

মানুষের পরিচয় মানুষ-ই। মানুষরে ভগবান বানানোর কিছু নাই। (মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস; এমন তাত্ত্বিক কথায় যায়েন না। কারণ ওইটার অ্যাপ্রোস আলাদা) 

মানুষরে মানুষ হিসেবে দেখেন, দেখতে শিখেন। এইটুকুই!  সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি একজনের দ্বিতীয় পরিচয় হোক সে নারী, ট্রান্স, গে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই আগে তারে মানুষ হিসেবে সম্বোধন করেন।

সবশেষে হোচিমিন এর লেখার খুব পছন্দের এক লাইন-

"আমি বলি আমার পেনিস আছে, বুকে চুল আছে এবং আমি নারী! এর সবকিছু নিয়েই আমি শাড়ি পরি। নারীর সংজ্ঞা আসলে কি? নারী হবার সংজ্ঞা আসলে কি? আপনি বা আপনারা একজন নারীকে কি শুধুমাত্র তার ব্রেস্ট এবং ভ্যাজাইনা এই দুটো দিয়েই সংজ্ঞায়িত করতে চান বা আমার নারী বন্ধুরা সেই সংজ্ঞাতেই পরতে চান? তাহলে এই আপনারা কারা?"

1111 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।