সুমাইয়া অনন্যা

সুমাইয়া অনন্যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ অনার্স ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত ও এক রিসার্চ ফার্মে অ্যাসিস্ট্যান্ট রিসার্চার হিসেবে কর্মরত।

এক গডফাদার ও তার সুহৃৎ, অনুসারী তৈয়্যবা, ঝর্ণা কিংবা আস্ত সমাজ

মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই বহুগামী, নারী-পুরুষ উভয়েই। একরাতের জন্য সহবাস সব ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে৷ কিন্তু কিছু মানুষ একে মনোগামী বা একগামিতার ব্যর্থতা মনে করেন৷ 
 
সেক্সথেরাপিস্ট ভোল্ফ মনে করেন, একগামিতা কনসেপ্ট কেবলই পুরুষের আবিষ্কৃত এক ধারণা, যাকে সাংস্কৃতিক অর্জন বলা যেতে পারে যার মাধ্যমে পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়৷ 
 
বিশাল সময়ের বিশাল চর্চার ফলে একগামিতা ব্যাপারটি এমনভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় যে তারা তাদের বহুগামী মনোভাব সারাজীবনের জন্য বিসর্জন দিয়েছে/দিবে নতুবা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই উন্মুক্ত সম্পর্কে থাকবে অগোচরে কেউ কাউকে না জানিয়ে কিংবা কেউ থাকবে, কেউ থাকবে না আর একেই কিনা আমরা প্রতারণা বলি (উইদিন ব্র্যাকেট আর কি)! 
 
প্রতারণা তো অবশ্যই! কিন্তু কেনো আমরা প্রতারণা করি? কেনো আমরা প্রকৃতি প্রদত্ত উন্মুক্ত সম্পর্কে যাই না? উত্তর ঐ যে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে বেড়ানো অভ্যাস কি একদিনে যেতে পারে? শরীর চাইলেও মন সায় দেয় কি করে? এতো পাপ! আধুনিক প্রগতিশীল নারী-পুরুষ অবশ্য পলিগ্যামিতায় বিশ্বাস করে কিন্তু তা মনে মনে, ঐ ঘরের বাইরেই, সঙ্গীকে না জানিয়েই। হাহাহা। 
 
সেই স্বীকারোক্তিতেও অবশ্য পুরুষের সংখ্যা বেশি নারীদের তুলনায় কেননা নারীর মস্তিষ্কে এক ঘরের কাজ, সংসারের কাজ,বাচ্চা পালার কাজ আর রাতে স্বামীর সঙ্গ। অন্য পুরুষ দেখছে কই তারা? ভাবতে পারছে কই তারা? আর ওইদিকে পুরুষ মানুষগুলো বাইরে বেরিয়ে গোটা দুনিয়া দেখে ফেলছে, জেনে ফেলছে কত কি, কত ভণিতা! কিংবা এইসব লুকোচুরি পতিদেবের সামনে এলে গোবেচারা স্ত্রী নারী -এই স্বামী, সংসার,বাচ্চা কিংবা তার থাকার শেষ সম্বল রেখে কোথায় যাবে? কি খাবে? কিভাবে বাঁচবে? ব্লা ব্লা চিন্তায় চিন্তায় "ভালো আমি একবারই বেসেছি, বিয়ে আমি একজনকেই করেছি, তাকে নিয়েই আমার জীবন" টাইপ শাবানা স্টাইলে মনোগ্যামী জীবন পার করে।
 
এইদিকে পতিদেবের তো আবার এইসবের ভয়টয় নাই একদম! তার থাকা, খাওয়ার হর্তাকর্তা তিনিই তাই এইসব সবার সামনে এলেও "ওইরম পুরুষমানুষ করেই" কিংবা "ওগো,আমার ভুল হয়ে গেছেগো টাইপ কান্দা কান্দা গলায় জসিম হয়ে শাবানারে বললেই আবার সাত খুন মাফ হয়ে যায় কেননা এবারও শাবানা চিন্তা করবে জসিমরে ছেড়ে রাগ করে যাবই বা কই আমি? থাকবোই বা কই? সাথে আছে আরেক ধর্ম! পুরুষ মানুষ চাইলে চার বিয়ে করতেই পারে তাই সব মিলায়ে এবেলাও শাবানারা জসিমদের মাফ কইরা দেয়/দিচ্ছে।
 
মূলত প্রসঙ্গটা এই শাবানা, জসিম কিংবা "এই তুমি নারীবাদী তাই ফ্রি সেক্স নিয়ে কথা বলতেছো (?)" এইসব কিছুই না। প্রসঙ্গটা হচ্ছে দেশের আস্ত এক রাজনীতিকে ঘিরে, সেই রাজনীতিরই একজন গডফাদার মামুনুল হক'কে ঘিরে কিংবা আমাদের  আশেপাশে থাকা এরকম আরো অসংখ্য গডফাদারকে ঘিরেই। একজন এলিট হুজুর নেতা যা করেছেন, তার সাথে যা হয়েছে সব কিছুই এই রাজনীতির মারপ্যাঁচ যা আপনারা দেখছেন এবং মজা নিচ্ছেন। স্যেকুলারগণ ১৩ দফায় দগ্ধ হয়ে আজ হেহে করে হাসছেন, লীগাররাও হাসছেন এই ভেবে যে, আচ্ছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিলি না? কেমন দিলাম? কিংবা কেউ কেউ দেখছে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা, নাগরিক হিসেবে তার প্রাইভেসী! 
 
সবই ঠিকাছে, সব! কিন্তু আমি কাকে/কাদের কে দেখছি জানেন? আমি দেখছি ঐ "আমিনা তৈয়্যবা" ও "জান্নাত আর ঝর্ণা" কে কিংবা সমাজে তাদের মতই থাকা অসংখ্য নারীকে। প্রথম স্ত্রী আমেনা তৈয়্যবাকে এদিক ওদিক থেকে ফোন করে কত কি বুঝানো হলো, কত কি মিথ্যা বলতে বলা হলো যার সারাংশ এমন যে তোমার স্বামী না? তুমি এইটুক দেখবানা? তুমি তার পাশে থাকো এখন। স্বামী যতই ভুল করুক, স্বামীই তো। তারে ছাড়া কই যাবা আর? (মজার ব্যাপার হচ্ছে, এইসব তাকে শিখিয়ে দেয়ার ব্যাপারে মামুনুল হক ছাড়াও আছে মামুনুল হকের এর বোন যিনি নিজেও নারী হয়ে কিনা সেই পুরুষের রাজনীতির গুটি হয়ে বসে আছে তা তিনিই জানেন না!) 
 
এদিকে আমিনা বেচারি ঠকে গিয়েও একমাত্র পতিদেবের ষড়যন্ত্রে হ্যাঁ তে হ্যাঁ, না তে না করেও ফ্রন্ট লাইনে চলে আসলো। আমিনা তৈয়্যবাকেও সবাই চিনলো শেষমেশ?
 
আমিনা তৈয়্যবা সন্তানদের নিয়ে নিজ বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন, এখনো ফেরেন নাই। থাকবে কি করে? স্বামীর পরকীয়া কিংবা ২য় বিয়ে যাইহোক তা নিয়ে চারপাশে এতো হাসিঠাট্টা আর সে কিছুই জানে না। সে মুখ দেখাবে কি করে? যতই হোক বঙ্গবধূ তো। 
 
অন্যদিকে জান্নাত আরা ঝর্ণার (মা.হকের কথিত ২য় স্ত্রী) মুখ দেখতে চায় না তার সন্তানেরা। অডিও রেকর্ডের শেষ কয়েক সেকেন্ড আমার মাথায় বাজছিলো খুব। তিনি বলেছিলেন তার সন্তানকে, কই যাবো আমি এখন বল? কই যাওয়ার জায়গা আছে আমার? তার চেয়ে আমি মরেই যাই এখন। এই বেচারি নারী না পারতেছে নিজের সংসারে ফিরতে, না পারতেছে মামুনুলের সংসারে যেতে। তার দিন কাটতেছে এদিক সেদিক গা ঢাকা দিয়ে বাঁচা আসামীর মতো। আর মা.হকের ভাষ্যনু্যায়ী বিয়ের প্রামাণ্য দলিল নাই তাই হয়তো আইনতই স্বামীর কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তিটুকুও তার পাওয়া হবে না। তাহলে আসলেই সে কই থাকবে? কি করবে? কেনোই বা তার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই? কেনোই বা নিজের জায়গা নেই? স্বামীই কি তাহলে এক ডুবে যাওয়া নারীর জন্য আস্ত এক ভেসে থাকা কাঠ? নিজের এই কাঠ নিজেরা কেনো হতে পারি না আমরা? 
 
ঐদিকে দেখেন, মামুনুল হকের পাশে তার পরিবার আছে, তার ধর্মের সব দোহাই আছে, তার রাজনৈতিক বন্ধুগণও আছে (অডিওতে শোনা গেলো আরেক নেতা বলছেন যে, মা.হ ভুল করেছেন কিন্তু এখন তারে বাঁচাইতে হবে আমাদের। হাহাহা)
 
একই ভুল ঝর্ণাও করেছেন কিন্তু তারে নিশ্চয়ই এতক্ষণে সমাজচ্যুত করে ফেলা হয়েছে। না আমি ঝর্নার অন্যায় কে ঢাকতে চাচ্ছিনা কিংবা তার জন্য আমার সহানুভূতিও উতলে উঠছে এমনটা না। ঝর্ণা কিংবা তৈয়্যবা এখানে উদাহরণ মাত্র। চারপাশে খোঁজ করে দেখেন, দুই বাড়ি পর পরই এমন ঝর্ণা, তৈয়্যবার অভাব নেই। এদের কথা কারা ভাববে? কেউ ভাবার নেই। তবে এরা নিজেরা কবে তাদের কথা ভাববে? 
 
এইসব প্রশ্নের ঝাঁকে কিছু সুন্দর উত্তরও থাকে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন বিতর্ক প্রতিযোগীতায় ফার্স্ট হওয়ার পর ডিসি স্যার আমায় বলেছিলেন, এতোটা বড় হও, এতোটা স্বাবলম্বী হও যাতে স্বামীর সাথে ঝগড়া লাগলে মার খেয়ে সেখানেই পরে না থেকে উল্টো বলে আসতে পারো, "আমি তোমার টাকায় খাই না। নিজের টাকায় খাই। বিদায়!"

1094 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।