সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

পুরুষতান্ত্রিকতার পোয়ালগাদায় আগুন লাগাতে না পারলে তান্ডব চলতেই থাকবে

একটা খবর দিয়ে শুরু করি, বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয়েছিলো খাওয়াদাওয়া। হঠাৎই বচসা, ক্রমে হাতাহাতি, প্যান্ডেল তছনছ।

নতুন কিছু নয়, আশ্চর্যেরও কিছু নয়, এদেশে বিয়ে বাড়িতে এমন ঘটনা আকছার ঘটে। খবর হওয়ার ফুরসত পায় না সে-সব রোজনামচারা। কিন্তু উপরোক্ত ঘটনাটি 'খবর' হতে পেরেছে বরপক্ষের পাতে মাংস কম পড়ার মতো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে তান্ডব বলে নয়, একজন অতি সাধারণ তরুণীর অসম সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য।

তান্ডব শেষে, মাথা ঠান্ডা হওয়ার পর, দুই পরিবারই মিটমাটের রাস্তায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বেঁকে বসেন কনে। সামান্য বিষয় নিয়ে ধুন্ধুমার ঘটানো পরিবারের ছেলের সঙ্গে সংসার করবেন না বলে সাফ জানিয়ে বিয়ের দিনই বিয়ে ভাঙলেন ওই তরুণী। তার জেদের কাছে হার মেনেছেন তরুণীর বাবা, পড়শি, পরিজন। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা একুশ বছরের ওই তরুণী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা হাততালির অনেক উপরে। অতি সাধারণ দিনমজুর ঘরের এই মেয়ে নারীবাদ কাকে বলে জানেন না হয়তো, কিন্তু তিনি যা করে দেখিয়েছেন, অনেক উচ্চশিক্ষিত স্বাবলম্বী মেয়ে এবং তার পরিবারও ভাবতে পারেন না।

খালি চোখে দেখলে হয়তো আমরা অনেকেই মেয়েটার ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখবো। কিন্তু আর পাঁচটা মেয়ের মতো এসব ঘটমান বর্তমানকে উপেক্ষা করে স্বামীর হাত ধরে সে যদি শ্বশুর বাড়িতে উঠতোও, তার আলোময় উজ্জ্বল ভবিষ্যত সম্পর্কে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারতাম তো? ভালো থাকতো মেয়েটা ওই বাড়ির বউ হয়ে?

পাত্র এবং পাত্রপক্ষ হওয়ার অলৌকিক সৌজন্যে তারা সবকিছুই ঘটানোর ছাড়পত্র পেয়ে যায়। আমরা 'পুরুষ', আমরা যা করবো তা-ই চলবে, এই মত চলাচলের পথ বন্ধ হওয়া জরুরি। পণপ্রথা তো অনেক চর্চিত চ্যবনপ্রাস, প্রতিটা মেয়ের অভিজ্ঞতা জানে আরও কত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কৌশল আছে পাত্রী এবং পাত্রীপক্ষকে লাঞ্ছিত করার। বউয়ের কানের দুলের ডিজাইন, গলার হারের ওজন, হাতের বালার গড়ন থেকে তার গায়ের রং, হাঁটাচলা, পা ফেলা, কথা বলা; তার বাবা-মা সাতগোষ্ঠীর ঠিকুজি কুষ্ঠি, অতীত বর্তমান, জিওগ্রাফি হিস্ট্রি, সবই নারীবিদ্বেষের এক একটা হাতিয়ার, পুরুষতান্ত্রিকতার মাইলফলক ।

শুধু নারী নয়, পুরুষতান্ত্রিকতার দাঁত কুকুরকেও কামড়াতে ছাড়ে না। অধিকাংশ মানুষ বাড়িতে মদ্দা (পুরুষ) কুকুর পোষে। কে জানে, হয়তো মদ্দা কুকুরের বুদ্ধি বেশি, অথবা, তাদের প্রভুভক্তি বা বিশ্বস্ততা বেশি! আর তো আর, অনেকে মেয়ে কুকুরকে খেতে দেওয়াও পছন্দ করে না। একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি, মর্নিং ওয়াকে যাওয়ার পথে, নিতান্তই ওরা আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে বলে কয়েকটা কুকুর-শিশুকে সামান্য কিছু খেতে দিই। তো, এক ভদ্রলোক একদিন বললেন, সবাইকে দেওয়ার দরকার নেই, ওই মদ্দা বাচ্চাটাকে দিবেন। এতক্ষণে খেয়াল হলো, ও! তাই তো! কুকুর-শিশুরও তো নারী-পুরুষ ভেদ আছে! আমি এতদিন খেয়ালই করিনি, খেয়াল করার প্রয়োজনই হয়নি আমার! অবস্থার অনেক অনেক পরিবর্তন হলেও এখনও আমরা জানি, অধিকাংশ পরিবারে পুরুষ সদস্যরা ভালো খাবারটা পায়, বেশিটুকু পায়। কিন্তু তাই বলে কুকুরের পথ-শিশুরাও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার! পুরুষতান্ত্রিক দাঁত-নখ কোথায় কোথায় গজায়, আর কাকে কাকে কামড়ায়, দেখেছেন!

রবীন্দ্রনাথের নিরুপমাকে মনে পড়ছে না? পণপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে পাত্র তাকে বিয়ে তো করেছিলো, কিন্তু রক্ষা করতে পারেনি। শাশুড়ির পুরুষতান্ত্রিক দাঁত-নখ আঁচড়ে কামড়ে খেয়েছিলো মেয়েটাকে। সেদিন যদি নিরুপমা এই রকম একটা প্রতিবাদ করতে পারতো! পুরুষতান্ত্রিকতার পোয়ালগাদায় আগুন লাগাতে না পারলে তান্ডব চলতেই থাকবে। নিরুপমাদের গল্প নতুন করে লেখা হোক, নিজের জীবন বাজি রেখে আমাদের খবরের প্রতিবাদী মেয়েটি কিন্তু সেই দাবিই রেখেছেন!

443 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।