সারথি বিশ্বাস

প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক, পশ্চিম বঙ্গ।

অসুস্থ সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসাই সুস্থতার লক্ষণ

'আমাদের বউ কোনোদিন যাবে না, যাদের পয়সা বেশি তাদের বউ চলে যায়' কথাটা কারা বলতে পারে বলে মনে করছেন? খুব সুদর্শন কেউ? একজন দায়িত্বশীল স্বামী? খুব বড়ো প্রেমিক? অথবা চরিত্রবান কোনো সুপুরুষ? একটাও না। কয়েকদিন মাত্র আগে আমি নিজের কানে যার মুখ থেকে এমন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কথা শুনলাম, সে একজন বেঁটেখাটো, বেঢপ ভুড়িওয়ালা, তোতলা, এবং অবশ্যই বেওড়া ( মাতাল)। যার বাংলা মদ অথবা চুল্লু কেনার পয়সাটাও তার মা স্বামীর পকেট থেকে চুরি করে জোগায়। চারিত্রিক স্ক্রু-গুলোও তার বেশ ঢিলেঢালাই। সন্তানের পড়াশোনার জন্য যার বউ ছাগল পুষে, মাটির ভাড় বানায় আর বুড়ো শশুরের পয়সায় ভাত খায়। কিন্তু সত্যি সত্যিই সে বউ কোথাও চলে যায় না। বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করে না। কেননা, স্বামীর অশ্রদ্ধা, অপমান আর অত্যাচারের ভাতেও নাকি সম্মান থাকে!

এই আমার দেশ ! এই ধরনের বউয়েরাও 'আহা! মেয়েটা খুব ভালো' শুনে সুখে থাকে বেশ! এটা একটা সংখ্যা মাত্র। এইরকম সুখে থাকার পাল্লাটা কিন্তু বেশ ভারি। সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে -এ বিশ্বাস কেবল পুরুষের নয়, নারীর নিজেরও। এ বিশ্বাস এদেশের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চালাকি কেবল মানুষের মনেই থাকে না, ভাষাতেও তার ছাপ রাখে। রমনীরা শুনে যতই গদগদ ভাবে আপ্লুত হয়ে চেপে রাখার চেষ্টা করুক না কেনো, আসলে কিন্তু তারাও বোঝে, এই ভাষার মধ্যে সংসারের অশান্তির দায় তার উপর চাপিয়ে রাখা হয়েছে আগেভাগে।

এই চাপের কারণে এদেশে মাতালের বউ যায় না, ধর্ষকের বউ যায় না, অত্যাচারীর বউ যায় না, লম্পটের বউ যায় না, পাগলের যায় না, কানার যায় না, এমনকী, অনেক নপুংসকেরও না! এই থেকে যাওয়ার পিছনে কেবল নিন্দার ভয়ই না, আরও অনেক কারণ থাকে। অর্থনৈতিক কারণটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বেশিরভাগ মেয়েরই কোনো স্বাবলম্বন নেই। তাই পেটের দায়ে পড়ে থাকতে হয়। তার উপর হিন্দু ডিভোর্সি মেয়ের বিয়ে হওয়াও বেশ কষ্টকর। হ্যাঁ, ইদানীং হচ্ছে, তবে বিশেষ কিছু কোয়ালিটি থাকলে তবেই। এই যেমন ধরুন, মহিলা যদি চাকরিবাকরি করে, বা যদি প্রকৃত সন্দরী(!) হয়, বা যদি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লাভের নিশ্চয়তা থাকে ইত্যাদি। এখন, ক'জন নারীর আর এসব ধন-দৌলত থাকে বলুন!

ডিভোর্সের পর দ্বিতীয় বিয়ের সহজ সম্ভাবনা না থাকায় হিন্দু মেয়েদের তরফ থেকে ডিভোর্সের আবেদন কম, বিশেষ করে যাদের কোনো অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন নেই। পুরুষদের ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা আছে, চাইলেই তারাও ডিভোর্স দিতে পারে না। এর পরেও কিন্তু ডিভোর্সের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি রিপোর্ট বলছে, সেখানে ডিভোর্সের আবেদন ক্রমশ উর্ধমুখী এবং এর সিংহভাগই স্ত্রীদের তরফ থেকে আসছে। তাদের আবেদনের কারণগুলির মধ্যে আছে ভরণপোষণ না দেওয়া, পণের দাবিতে অত্যাচার, বনিবনা না হওয়া, স্বামীর সন্দেহ বাতিকতা, অন্য নরীর সঙ্গে সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত ইত্যাদি। লক্ষ্য করবেন, ডিভোর্সের আবেদনে এখন কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক কারণই জড়িয়ে নেই, সংঘাতটা ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে।

গেলো গেলো রব তুলে লাভ নেই। এটাই সুস্থতার লক্ষণ। মেয়েরাও নিজেকে মানুষ ভাবতে শিখছে, দাম দিতে শিখছে তার জীবনটার। 'মানিয়ে নে মা, মানিয়ে নে মা', শুনতে শুনতে 'আর না' বলতে শিখছে। জীবনের সবক্ষেত্রেই প্রয়োজনে এই 'না' বলতে পারাটা খুব জরুরি। যাঁরা ভাবছেন, এতে সমাজে অস্থিরতা বাড়বে, স্থিরতা আনতে তারা মেয়েদের যত্নে রাখুন। শুধু থাকা-খাওয়ার যত্ন নয়, তাদের মনেরও যত্ন নিন। থাকা-খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটু সম্মান আর শ্রদ্ধাও একজন মেয়ে তার শশুরবাড়ির কাছে, তার স্বামীর কাছে ডিজার্ভ করে। ঘরের বউটি শুধু শরীরই নয়, মানুষ তো, তাই তার একটা মনও আছে ! মেয়েরা শুধু ত্বকের যত্নই করে না, মনের যত্নও তারা একটু চায় বৈকি!

এই দেশ সীতা-সাবিত্রীর দেশ, বেহুলার দেশ! আর আপামর নারী, তোমরা সতীর দেশের কন্যা গো! কাজেই, তোমাদের আগুনে পোড়ালে পুড়তে হবে, বনে তাড়ালে যেতে হবে; স্বামীটি মরে গেলেও, চলে গেলেও, ভেসে গেলেও স্বামীর প্রতি ভক্তিটি অটুট রাখতে হবে, এসব ঘুমপাড়ানি গল্প শুনে থাবড়া খেয়ে মেয়েদের আর ঘুম আসছে না ইদানীং। বিশেষ করে শিক্ষিত, স্বাবলম্বী মেয়েদের তো নয়ই। তাই স্ত্রীদের তরফ থেকে ডিভোর্সের আবেদন বাড়ছে। হাজারো রকমভাবে বঞ্চিত করেও স্ত্রী-ধনটি ঠিকঠাকই সঞ্চিত থাকবে চিরকাল, এই ভাবনা যুগযুগ ধরে না ভাবাই ভালো। পুরুষরা এ বিষয়ে ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন।

ডিভোর্সের আবেদন শুধু স্ত্রীরাই করছে, এমন নয়। স্ত্রীদের বদমেজাজ, সংসারে অমনোযোগ, সন্তানহীনতা, অবাধ্য হওয়া ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে পুরুষরাও ডিভোর্সের আবেদন করছে। কারণগুলো অবশ্যই কিছুটা ন্যাতানো, তাই বলে এমন নয় যে মেয়েরা কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে না। অনেক স্ত্রী-ই বিয়ের পরদিন থেকে স্বামীটিকে নিজের সম্পত্তি ভেবে বগলদাবা করে রাখতে চায়, কটার সময় সে বাড়ি ঢুকবে, অফিসে কখন টিফিন করবে, কেমন করে জল খাবে, রাস্তায় কতবার হিসি করবে সব ঠিক করে দেয়। অনেকে আবার শশুরবাড়ির লোকজনদের মোটেই পছন্দ করে না, স্বামীকে তাদের দায়িত্ব নিতে বাধা দেয়। জোর করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্যত্র থাকতে বাধ্য করে, এমনকী, স্বামীটিকে তার মায়ের সঙ্গেও দেখা করতেও দিতে চায় না। উল্টো দিকে এমন অনেক 'বাবুসোনা' গোছের পুরুষ আছে, যারা কোনোদিন সাবালক হয় না। আমৃত্যু নাবালক এইসব খোকারা মায়ের অনুমতি না নিয়ে রাতে দরজায় খিল দিতেও সাহস পায় না। সব মিলিয়ে, অনেক নারী-পুরুষই কোনো সমস্যাকে বাড়ির মেনি বিড়ালটার মতো পুষে রাখতে চাইছে না আর। জল তাই ডিভোর্স পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

আমরা নিজের মেয়েকে শশুর বাড়িতে কেমন দেখতে চাই, আর ছেলের বউকে কেমন দেখি তার একটা গল্প বলি, গল্প হলেও সত্যি। এক মা বলছে, আমার ছেলেটা এক্কেবারে স্ত্রৈণ হয়ে গেছে, একদম গাধা, বউয়ের কথায় উঠে আর বসে। আমার কপালটাই খারাপ। কিন্তু আমি ভাগ্য করে জামাই পেয়েছি, খুব ভদ্র আর ভালো ছেলে, আমার মেয়ে যা বলে তাই শোনে। মেয়ের কোনো কথাই ফেলে না।

তো, এই হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি! এর তো কোনো পরিসংখ্যান নেই, রিপোর্ট নেই, জীবনে জীবনে জড়াজড়ি করে থাকে এসব অভিজ্ঞতা। তবে রিপোর্ট বলছে, লকডাউন পিরিয়ডে গার্হস্থ্য সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। অবশ্যই এর শিকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েরাই। যদিও একথা শুনে ফেসবুক আমাকে রাষ্ট্রিকেট করে ছাড়বে। কেননা, ফেসবুক বলছে লকডাউনে পুরুষরাই বেশি অত্যাচারিত, তাদের বাসন মাজতে হয়েছে, কাপড় কাচতে হয়েছে, ঘর মুছতে হয়েছে, বউয়ের মাথার উকুন বাছতে হয়েছে। হাস্যকরভাবের এসব কাজ নারীর একার না, পুরুষেরও। পুরুষ সংসারের কাজ করলে তা তাঁর উপর অত্যাচার হয় কীভাবে! আমার মাথায় ঢুকে না। 

এর বাইরে যে সমস্ত গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে লকডাউন পিরিয়ডে, তার পিছনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তো আছেই, তার থেকেও বেশি দায়ী আমাদের মানসিক জগৎ। বহু দাম্পত্য সম্পর্কই ঝুলে আছে কোনো না কোনো বাধ্যবাধকতার সুতোয়, যে সুতোয় প্রেম-ভালোবাসা বা শ্রদ্ধার, কোনো গাঁট-ই নেই আর। তাদের পরস্পরের সঙ্গে কাটানো সময়ে কোনো আনন্দ নেই, আলো নেই, বাতাস নেই। এই দমবন্ধ করা পরিবেশে লকডাউনের দীর্ঘ সময় পাশাপাশি কাটাতে তারা অনেক বেশি হাপিয়ে উঠেছে তাই, তিক্ততা আরও বেড়ে গিয়েছে। আর যে কোনো রকম অস্বাভাবিক পরিস্থিতির অস্বস্তির ঝাল মেয়েদের উপর ঝাড়াই আমাদের চিরকালীন অভ্যাস। কেননা, ঝাল ঝাড়ার ওটাই সবচেয়ে দুর্বল এবং সেই কারণেই নিরাপদ জায়গা! জায়গাটা চিরকাল এতোটা নিরাপদ নাও থাকতে পারে, বর্তমানে স্ত্রীদের তরফ থেকে ডিভোর্সের আবেদনের সংখ্যাধিক্য অন্তত সেই নিরাপত্তাহীনতার সাক্ষ্যই দিচ্ছে। সমাজও ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে, মেয়েদের বানের জলে ভেসে আসা একটা প্রাণী মাত্র মনে করছে না অনেকেই, তাদের পাওয়া-না পাওয়ার সব হিসাবকেই গুরুত্ব দিতে শিখছে। হিসাব বুঝে নিতে বলছে।

যে কোনো ধরনের অসুস্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাই সুস্থতার লক্ষণ। বেরিয়ে আসতে না চাইলে, সম্পর্ককে সুস্থ করতে হবে সব আগে। নিজের জন্য, সন্তানের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্যও বটে! তাই, সম্পর্কের জানালাগুলো খুলুন, একটু রোদ, বাতাস আসুক। সম্পর্ক তরতর করে বেড়ে উঠুক। মুকুলিত হোক। ফুল ফুটুক।

454 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।