অহিদা আঁখি

অনলাইন এক্টীভিস্ট।

বিয়ের আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখুন

করোনার এই সময়টাতে ডিভোর্সের হার বেড়ে গেছে এটা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে করোনাকালীন সময় ছাড়াও দেশে আগের তুলনায় ডিভোর্সের হার বেড়েছে। ডিভোর্স হওয়ার কিছু কারণ আমি আজ উল্লেখ করবো যেগুলো সম্পর্কে আগে কেউ কখনো লিখেছে কিনা আমার জানা নেই। কারণগুলার কথা আমি এজন্যে উল্লেখ করবো, আমার পরিচিত অনেক মানুষের মধ্যে এই এসবের জন্যই ডিভোর্স হতে দেখেছি এবং যথারীতি অবাক হয়েছি।

প্রথম কারণ হিসেবে আমি দেখেছি, বিয়ের সময় কাবিননামায় দেনমোহরের যে টাকাটা ধার্য করা হয় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছেলের ইনকামের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়। যার কারণে দেনমোহরের টাকাটা ছেলে বিয়ের সময়ই পরিশোধ করতে পারে না। এই টাকাটা পরিশোধ করতে না পারার কারণে দেখা যায়, ডিভোর্স করলেই মেয়েটা বিশাল অংকের একটা টাকা পাবে, সেজন্য ডিভোর্সের দিকে ধাবিত হয় এবং দেনমোহরের টাকার জন্য আদালতে মামলা করে। আমরা অনেকেই মনে করি দেনমোরের পরিমাণ বেশি হলে হয়তো বিয়েটা টিকে থাকবে কিন্তু এটা আসলে আদৌ সত্য নয়। তার প্রমাণ হিসেবে আমরা দেখি লাখ টাকা, কোটি টাকা দেনমোহর থাকার পরেও বিয়ে কত সহজেই ভেঙে যাচ্ছে।

যদিও আমি দেনমোহরের পক্ষপাতী না, তথাপি মনে করি, আমাদের উচিত বিয়ের সময় ছেলে যতোটা টাকা পরিশোধ করতে সক্ষম ঠিক সেই পরিমাণ টাকা দেনমোহর হিসেবে রাখা। সেটা হতে পারে এক হাজার টাকা/ দুই হাজার টাকা কিংবা এক লাখ বা দুই লাখ অর্থাৎ ছেলের এবিলিটি অনুযায়ী। তাহলে, বিয়ের মধ্য দিয়ে যে সম্পর্ক রচিত হবে, তাতে শুধু মানব মানবীর সম্পর্কই মুখ্য থাকবে, সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকবে, সম্পর্কে টাকার বন্ধন থাকবে না।

আর দ্বিতীয় কারণ; আগের তুলনায় এখন যেহেতু ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও চাকরি করছে আর সেই চাকরি সূত্রে হাজবেন্ড ওয়াইফ দুই জায়গায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে। দূরত্বের কারণে দু'জনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ব্যাপারটা সহজেই কমে যাচ্ছে। এখন ইন্টারনেটের যুগ। দু'জনের মধ্যে সম্পর্কের ভিতটা কোনো ভাবে নড়বড়ে হয়ে গেলে তৃতীয় একজন খুব সহজেই সেখানে প্রবেশ করতে পারে। আর ডিসট্যান্ট রিলেশন বিয়ের পরে হলে হাজবেন্ড ওয়াইফ দু‘জনের মধ্যেই সন্দেহ নামক একটা জটিল রোগ সৃষ্টি হয়। যে রোগের ফলাফল ডিভোর্সে গিয়ে পৌছায় সেটা আমরা অহরহ দেখতে পাচ্ছি।

তাই আমার পরামর্শ হলো বিয়ের পর দু‘জনের একই বাসা থাকা এবং সবকিছু একে অপরের সাথে শেয়ার করা। বন্ধুর মতো হয়ে থাকা। নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছা অন্যের ওপরে চাপিয়ে না দেয়া। প্রতিটি মানুষই ভিন্ন। আপনি যদি আপনার সঙ্গীকে আপনার মতো করে বানাতে চান তাহলে সেই রিলেশন কখনোই সুখের হবে না। যেমন ধরেন আপনি ইংরেজি খুব ভাল বোঝেন কিন্তু আপনার সঙ্গী ইংরেজিতে উইক। তখন তার এই উইকনেস নিয়ে যদি আপনি তাকে ছোট করে কথা বলেন সেটা হবে আপনার চূড়ান্ত বোকামি। আপনার চেহারা ভালো, আপনার সংগীর চেহারা ভালো না এটা নিয়ে যদি আপনি তার কাছে বা আপনার বন্ধুদের কাছে তার চেহারা নিয়ে অপমানসূচক কথা বলেন তাহলে তো আপনার সঙ্গী কষ্ট পাবে এবং সে আপনাকে নিয়ে ইনসিকিউরড ফিল করবে। সম্পর্ক যে শুধু টাকা পয়সার জন্য নষ্ট হয় তা না, বেশিরভাগ সম্পর্কই নষ্ট হয় ভালো আচরণ করতে না পারার জন্য। আপনি যদি আপনার সঙ্গীকে ছোটো করে কথা বলেন তার সামনে বা তার অগোচরে তাহলে মনে রাখবেন আপনাদের সম্পর্ক কখনই সুন্দর হবে না। ফলাফল ডিভোর্স হলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। তাই বলব বিয়ের পর ডিসট্যান্ট রিলেশন থেকে দূরে থাকুন এবং সঙ্গীর সাথে ভাল ব্যবহার করুন যাতে তার মনে না হয় আপনি তাকে ছোটো করে কথা বলছেন।

তৃতীয় কারণ হিসেবে আমি বলবো, বিয়ের আগে পরস্পর পরস্পরকে না জানা, না বুঝা। আমাদের দেশে অধিকাংশ বিয়েই পারিবারিকভাবে দেখেশুনে দেয়া হয়। ফলে ভবিষ্যৎ যুগল পরস্পরকে ভালোভাবে না জেনেই পরিবার গঠন করে ফেলে। ফলস্বরূপ নিজদের মধ্যকার বোঝাপড়া ঠিকঠাকভাবে হয় না। পরবর্তীতে সম্পর্কটা বা পরিবারটা টিকে থাকে একপাক্ষিক মুখ বুজে থাকার মধ্য দিয়ে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই মুখ বুজে থাকাটা মূলত নারীই করে। এখন যেহতু সমাজ বদলেছে, নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে, ফলে আগেরকার মতো এখন একপাক্ষিক মুখ বুজে থাকার মধ্য দিয়ে বিয়ে টিকে থাকছে না, ভেঙে যাচ্ছে, ডিভোর্স হচ্ছে।

বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে দু'জন দু'জনকে বুঝতে যতোটুকু কাছে আসা দরকার ঠিক ততোটুকু কাছে আসেন আপনারা। বিয়েটা সারাজীবন পাশে থাকার একটা চুক্তি, সেই চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার আগে অন্তত ১ বছর সময় নিন দু'জন দু'জনকে বুঝতে জানতে। আপনি সঙ্গীর থেকে কতোটা আশা করেন বা সে আপনার থেকে কতোটা কী আশা করে এসব বিষয় আগে থেকে ক্লিয়ার হয়ে নিন। নিজের ভালো দিকগুলো তাকে জানানোর সাথে সাথে আপনার খারাপ দিকগুলোও তাকে জানিয়ে দিন। যাতে বিয়ের পরে সে আপনার খারাপ দিক জেনেও অবাক না হয়।

আবার অনেকেই আজকাল দ্বিতীয় বিয়ে করার সময়ে প্রথম বিয়ের কথা গোপন রেখে বিয়ে করে। এতে কিন্তু বিয়ের পরে আপনাদের সম্পর্কের জটিলতা আরও বেড়ে যায়। মিথ্যা বলার কারনে আপনার প্রতি তার বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয় সহজেই। অথচ এই বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ একে অপরের প্রতি না থাকলে সেই সম্পর্ক কখনো সুন্দর হয় না। তাই নিজের সমস্ত খারাপ দিকগুলো সঙ্গেীকে বিয়ের আগেই জানিয়ে দিন। এতে যদি সে বিয়ে করতে না ও চায় মনে রাখবেন তবু সে আপনাকে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করবে। কারণ আপনি সত্য বলেছেন। যে সম্পর্ক মিথ্যার ওপর ভিত গড়ে তৈরি হয় সে সম্পর্ক কখনই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক হয় না।

পরিশেষে বলবো, বিয়ে টিকে থাকা না থাকার মধ্য দিয়ে নারী কিংবা পুরুষ কারো একার দোষ অথবা গুণ প্রকাশিত হয় না। বিয়ে যেমন মানব সমাজের সবচেয়ে প্রাচীন সংগঠন পরিবার গঠন করে, তেমন করে বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সকেও আমাদের সহজভাবে নিতে হবে। ডিভোর্স হওয়া মানেই সমাজের জন্য মন্দ কিছু, তা নয়। এরও ইতিবাচক দিক আছে, বিশেষ করে নারীরা এরমধ্য দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। আমি মনে করি, বিয়ে এবং ডিভোর্স দুটোকেই আমাদের স্বাভাবিকভাবে নিতে হবে।

758 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।