ফারজানা শারমীন সুরভি

জন্মস্থান ঢাকা, বাংলাদেশ। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্দান ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করছেন। পেশায় একই বিভাগের গ্র্যাজুয়েট টিচিং এসিস্টেন্ট। লেখক হওয়ার স্বপ্ন নেই, কিন্তু লেখালেখির নেশায় একটা জীবন কাটিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখেন।

নারীবাদী নারীর অসাধারণ হওয়ার দায়

সম্প্রতি ফেসবুকে আমার বন্ধুরা অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করলেন এই বলে যে- "নারীবাদী একজন নারী কেন এবিউজ সহ্য করেছে? তার কাছ থেকে তো অসাধারণত্ব প্রত্যাশা করি আমরা"!
 
"সাধারণ" এবং "অসাধারণ" নারী, মানুষের মনস্তত্ত্ব কি এরকম সাদা-কালো কোনো ব্যাপার? আমাদের আচরণ, চিন্তা, কাজ-সব কিছুর মধ্যেই ধূসর সব এলাকা থাকে। ভালোবাসার বিভ্রমে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ঘৃণার ঘরে ঢুকে পড়ি। আবার ঘৃণাতে মুখ ফিরিয়ে নিতে গিয়ে, পুরানো ভালোবাসার ছায়া দেখে থমকে যাই। পুণ্যবান হওয়ার শপথ করে, একদিন আমরা গন্ধম ফল খেয়ে ফেলি। অনুতাপে পুড়ে গন্ধম উগরে ফেলে দেই। তবু সে পাপের তিতকুটে স্বাদ বার বার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পুণ্যবান হওয়া একটি মিথ মাত্র!
 
নারীবাদের আদর্শে একজন মানুষ বিশ্বাস করতে পারে। জীবনে চর্চা করার প্রচেষ্টাও করতে পারে। কিন্তু পিতৃতন্ত্র থেকে মুক্ত হওয়া একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। একজন সচেতন এবং শক্ত মেরুদণ্ডের নারীও এবিউসিভ সম্পর্কের মারপ্যাঁচে আটকে যায়। কখনো কখনো এটা বুঝতেই তার সময় লাগে যে, সে একটি এবিউসিভ সম্পর্কে আছে। কখনো আবার এটা বুঝলেও, সে সঙ্গীকে শুধরানোর সুযোগ দেয়। কেননা আশা এবং ভালোবাসা এক ভীষণ গোলমেলে ব্যাপার! কোনো সরলরৈখিক অনুভূতি নয়!
 
শেষ পর্যন্ত কোনো নারী যখন তাই এবিউসিভ সম্পর্ককে সনাক্ত করে এবং মুক্ত হয়ে আসে, তখন শুধু আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। কারণ চক্র থেকে সে বের হয়ে এসেছে। পিতৃতন্ত্র থেকে মুক্ত হওয়ার নিরন্তর প্রক্রিয়াতে সে আছে। ভিক্টিম থেকে সারভাইভার হয়েছে।
 
অনেক সময় এবিউজ এবং সহিংসতা দ্বিপাক্ষিক হয়। সরল ভাষাতে বলতে গেলে, "ও আমাকে চড় মেরেছিলো। আমি ওকে খামচি দিয়েছি"। সেক্ষেত্রে এই বিষাক্ত সম্পর্ককেই প্রেমিক-প্রেমিকা স্বাভাবিক ধরে নেয়।
 
আমেরিকার একটি 'ভিক্টিম সেন্টার'-এ আমি ইন্টার্নশিপ করেছিলাম। সে সুবাদে ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সংক্রান্ত কিছু প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিলো। সেরকম এক প্রশিক্ষণের ট্রেনিং ম্যানুয়ালের একটি প্যারাগ্রাফের বাংলা করছি নিচের অংশে।
 
"যাদেরকে কখনো এবিউজের শিকার হতে হয়নি, তারা সবসময় এটি চিন্তা করে বিস্মিত হয় যে- একজন নারী কেনো এই ধরনের সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে পারে না! তারা সেই নারীকে প্রশ্ন করে- তুমি কেনো বছরের পরে বছর ধরে এই এবিউজ সহ্য করলে?
 
এক্ষেত্রে আমাদের সবার জানা উচিত যে, একটি সম্পর্ক কখনো প্রথম দিন থেকে এবিউসিভ থাকে না। সম্পর্কের প্রথম অধ্যায়ে থাকে ভালোবাসা আর ঘনিষ্ঠতার চমৎকার সব সময়। তাই ভিক্টিম সম্পর্ক থেকে বের হতে চাইলেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়।
 
একটি এবিউসিভ সম্পর্কে কিন্তু সবসময় সহিংসতা দেখা যায় না। কখনো কখনো এমন সব সুন্দর মুহূর্ত আসে যে, নারীটির মনে হয়- হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই আমার সঙ্গীকে আমি ভালোবেসেছিলাম। একজন এবিউজার তার সঙ্গীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যে জাল বুনে- সেখানে ঘনিষ্ঠতা, রোমান্স, সহিংসতা এবং এবিউজ সবকিছু একইসাথে থাকে।
 
তাই যে নারী নির্যাতিত হয়, সে প্রায়ই সংশয়গ্রস্ত হয়। ভিক্টিম নারী ভাবে- আমরা তো ভালোই আছি। শুধু মাঝে মাঝে আমার সঙ্গীর আচমকা কী যেন হয়! সে আমাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে কিংবা সহিংস হয়! তবে কি আমারই কোথাও ভুল হচ্ছে?
 
এক্ষেত্রে জানা উচিত যে, ডমেস্টিক ভায়োলেন্স অবশ্যই কোনো র‌্যান্ডম ব্যাপার নয়। এটি একটি কমপ্লেক্স প্যাটার্ন। এবিউজাররা বিভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করে। এবিউজার শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অন্যান্য এবিউসিভ আচরণের মাধ্যমে ভিক্টিমকে নিয়ন্ত্রণ করে। সাধারণত এবিউজের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি হতে থাকে।"
 
যদিও এই লেখাটিতে আমি বারবার "নারী" বিশেষ্য ব্যবহার করছি, মনে রাখা উচিত যে- অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষও ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের ভিক্টিম হয়ে থাকে। সম্পর্ক টেকানোর জন্য নারী কিংবা পুরুষ যে কেউই অনেক মরিয়া আচরণ করতে পারে। কারণ আমরা সবাই ভীত! আমাদের আছে একলা থাকার ভয়, সমাজের চোখ রাঙ্গানির ভয়, আর কারো হাতে হাত না রাখতে পারার ভয়। এইসব ভয় থেকে মুক্ত হতে পারলেই হয়তো তখন মানুষ এবিউসিভ সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসে। এই বের হয়ে আসাটাই দিন শেষে জরুরি!
 
সবশেষে আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই যে- একজন মানুষ হিসেবে অন্য একজন নিপীড়নের শিকার মানুষের প্রতি আমাদের এমপ্যাথেটিক আচরণ করা উচিত। ভিক্টিম থেকে সারভাইভর হওয়াটি একটি প্রক্রিয়া। সব ভিক্টিম শুরুতেই প্রতিবাদ করতে পারে না। সময় লাগে। ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো হয়ে যাওয়া একজন মানুষের উঠে দাঁড়াতে সময় লাগে। তাই চট করে কাউকে জাজ করাটা খুব অসংবেদনশীল আচরণ মনে হয় আমার। যে ভিক্টিমের জীবন আমার যাপন করতে হয়নি, যার জুতাতে পা গলিয়ে আমার হাঁটতে হয়নি, তাকে অতোটা সহজে আমি জাজ করি না!

218 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।