মন্জ্ঞুশ্রী সামন্ত

মঞ্জুশ্রী সামন্ত ভারতের, পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া নামক জেলার বাসিন্দা। তিনি মানবীবিদ্যাচর্চা নিয়ে মাস্টার্স করেছেন। মেয়েদের কথা তাকে বড্ড ভাবায়।

অন্দরমহলের বৈবাহিক ধর্ষণ বা ম্যারিটাল রেপ

বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলাটা আমাদের জরুরি। বহু মানুষই প্রকাশ্যে এখন এ বিষয়ে আলোচনা করে থাকেন। তাও এটি অন্দরমহলের খুব গভীরে খুঁটি গেড়ে  রয়েছে। আমার মনে হলো, এই বিষয়ে কিছু কথা বলি।

প্রথমেই, কিছু সত্য ঘটনার কথা বলা যাক। যেমন, এক মহিলা পেশায় একজন ডাক্তার। স্বামীও পেশায় ডাক্তার। মহিলা থাকেন কোয়ার্টারে। স্বামী নিজস্ব বাড়িতে থাকেন। স্বামীটি বেশ আন্দোলনরত, বিজ্ঞানমনস্ক, এক প্রতিবাদী মুখ হিসাবে সমাজের কাছে নিজেকে বহিঃপ্রকাশ করে থাকেন। ভদ্রলোক আবার অগোছালো, আবার পুরুষ মাত্রই কিছুটা অগোছালো হওয়া বেশ মানায়। তাই তার জামা কাপড়, বাড়ি-ঘর গুছিয়ে তোলার জন্য সপ্তাহে একদিন সময়ও দিতে হয় স্ত্রী'কে গিয়ে উপস্থিত হয়ে। এই আধুনিকমনস্ক ভদ্রপুরুষই প্রতিদিন রাতে স্ত্রী'র কোয়ার্টারে উপস্থিত হন জোরপূর্বক নিজের শারীরিক চাহিদা পূরণ করার জন্য, অর্থাৎ মহিলাটির না ভালোলাগা বা যেকোনো মতামত'কে ছুড়ে ফেলেই। একদিন এমনও হলো যে মহিলাটির ইউটেরাস সার্জারী হয়েছে, স্বামী বেশ অসুবিধায় পড়লেন বিশ্রাম দিতে গিয়ে। বলেও ফেললেন, নিজের শারীরিক চাহিদা পূরণ করতে তিনি এই স্ত্রী'কে ত্যাগ করে অন্য স্ত্রী আনতে পারেন। তাহলে, নারী মানে কি স্ত্রী শুধুই একটা যৌনাঙ্গ বোঝায়? যেই যৌনাঙ্গ কে সবদিন সুস্থ সুন্দর রাখতে হবে শুধু একটি পুরুষ'এর যৌনচাহিদাকে বাঁচিয়ে রাখতে? মহিলাটি অনেক বছর পর সেদিনের কথা ভেবে বলছেন, "আজও আতঙ্ক হয় সেই দিনগুলো ভেবে"। 

আরেক বছর ঊনষাট-ষাট'এর মহিলা বলছেন, আজও তার স্বামী, প্রায় আটচল্লিশ বছর ধরে জোরপূর্বক মেরে ধরে নিজের শারীরিক চাহিদা পূরণ করে চলেছেন। মহিলাটি আজও বেরিয়ে আসতে পারেননি এমন সম্পর্ক থেকে। সারা শরীরে রোজ মার খাওয়ার চিহ্ন সংখ্যা বাড়তে থাকে, এগুলো বয়ে নিয়েই আবার দিন- রাত স্বামী'র সেবাও করেন। আরেক বয়সে ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের মহিলা বলছেন, তার স্বামী এলে ঘরে ঢুকতে ভয় করতো।

এমন সহস্রাধিক উদাহরণ রয়েছে আমাদের বাস্তব সমাজে, সারা পৃথিবী জুড়েই। 

বৈবাহিক ধর্ষণ বা ম্যারিটাল রেপ বলতে স্বামী কর্তৃক জোর করে বা ভয় দেখিয়ে, স্ত্রী'র অনিচ্ছা ও অসম্মতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। বিবাহের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বামী ভেবে নেয় স্ত্রী তার সম্পত্তি এবং বিবাহের দ্বারা লাইসেন্স পেয়ে গেছে। তাই তার যেভাবে ইচ্ছা স্ত্রীকে ভোগ করা যায়, সে করতে পারে। স্ত্রী যদি "না" বলে বা অসম্মতি জানায়, তাহলে স্বামীর জেদের নেশা বাড়ে "না" - কে অগ্রাহ্য করার। সমাজের বেশি সংখ্যক মানুষের মতে বিবাহ হলো একটি চুক্তির মতো। এই চুক্তির দ্বারা স্ত্রী'কে 'বস্তু' ভেবে দান করা হয় স্বামী'র কাছে। তাই স্ত্রী কোনোমতে স্বামীর ইচ্ছা কে না বলে সরে আসতে পারবে না। "না" কে সম্মান না জানিয়ে অগ্রাহ্য করাকেই অধিকাংশ পুরুষ পুরুষত্ব ও স্বামীত্ব'র অধিকার ভেবে নেয় এবং কোনোদিন এই অগ্রাহ্য'কে অপরাধ বলে গণ্য করে না। অধিকাংশ স্ত্রী জানে না, তার সাথে ধর্ষণ হয়ে চলেছে দিনের পর দিন। তাই এক্ষেত্রে প্রকাশের মাত্রাও কম "বিয়ের পর আবার ধর্ষণ হয় নাকি?" এমন সামাজিক চিন্তার কারণে। বৈবাহিক ধর্ষণ সম্বন্ধে অজ্ঞানতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক চাপ এর কারণে ধর্ষিতা নারীটির আর্তনাদ সারা জীবনের মতো গুমরে চাপা পরে থাকে। তাই পরিত্রাণের উপায়ও থাকে না সেভাবে।

বৈবাহিক ধর্ষণ'কে সমাজ বেআইনী হিসাবে দেখে না। সমাজ একে ধর্ষণও বলতে চায় না। তাই ৩৬টি দেশে বৈবাহিক ধর্ষণ আইনের চোখে অপরাধমূলক নয়, ভারত হলো তার মধ্যেই একটি দেশ। ফলে, ধর্ষণে অভ্যস্ত পুরুষের মধ্যে কোনোপ্রকার ভয়তো কাজ করেই না, বরং দিনের পর দিন বুক উঁচিয়ে ধর্ষণের চর্চা করতে থাকে এবং শিকার হতে থাকা নারী অবসাদগ্রস্ত জীবন কাটাতে থাকে।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি দীপক মিশ্র'র মতে, বৈবাহিক ধর্ষণ কোনো অপরাধ নয়, এমন আইন আনলে দেশের পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এর অর্থ কি তাহলে এটাই? যে অধিকাংশ পরিবারে যে ধর্ষণ হয়ে চলেছে নিয়মিত, তা কারো অজানা নয় এবং বৈবাহিক ধর্ষণ'কে আইনি অপরাধের তালিকায় আনলে স্বামীত্ব হারাতে থাকবে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারগুলো থেকে, ফলে পরিবার ভেঙে পড়বে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন না যে দেশে বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত কোনো আইনের প্রয়োজন আছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭৫ ধারায় বলা হয়েছে ১৫ বছরের বেশি বয়সের বিবাহিত নারীর সাথে তার স্বামীর যৌন সম্পর্ক যেমনই হোক না কেনো, একে ধর্ষণ বলা চলে না।

বাড়ির বাইরে ধর্ষকদের তাও হাজত হয়, বিচার হয়। বাড়ির ভেতরে একটি বৈবাহিক সম্পর্কে ধর্ষণ হলে কোনো সুযোগ থাকে না বিচারের এবং নারীটির জীবন চিরদিনের মতো অভিশপ্ত হয়ে ওঠে। অধিকাংশ পুরুষের চোখে নারী শুধু ভোগের সামগ্রী, তাই নারী'কে যেমন ইচ্ছা  দুমরে মুচড়ে ভোগ করতে চায় পুরুষ।

বিবাহের পর পুরুষের ধারণা- মন্ত্র পড়ে, দেবতা সাক্ষী রেখে, সবার অনুমতি নেওয়ার অর্থ হলো, স্ত্রী'র দেহে ইচ্ছামতো আধিপত্য বিস্তার করবে এবং স্বামী'কে বঞ্চিত করার অধিকার কোনো স্ত্রীর নেই।

ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনসম্পর্ক করা কখনোই সেক্স না, বরং একটি চরম অপরাধ, এক শব্দে ধর্ষণ। যেমনভাবে গাড়ি, বাড়ি, টিভি, টাকা দিয়ে কিনে এনে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যায়, সেই পণ্যগুলির নিজস্ব কোনো মতামত থাকে না। তেমন, বিবাহের দ্বারা নারীকেও পণ্যের ন্যায় কিনে নেয় স্বামী। তারপর আর নারীর নিজস্ব কোনো মতামত হ্যাঁ বা না থাকতে পারে না; এ হল আমাদের সামাজিক ধারণা। নারীও একেই তার নিয়তি ভেবে নেয়। সমাজের ভয়, নিজের মান সম্মান বাঁচাতে, বাবা-মা'র সম্মান এর কথা ভেবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আপোষ করেই জীবন কাটিয়ে দেয় স্ত্রীরা।

কোনো স্ত্রী প্রাথমিকভাবে জানে না স্বামীর দ্বারাও তার ধর্ষণ হয়। কারণ, সমাজ দ্বারা মাথায় এটা ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, বিবাহের পর স্বামীকে তুষ্ট করাই স্ত্রী'র প্রধান লক্ষ্য এবং নিজেকে স্বামীর কাছে সঁপে দেওয়াই হবে তার প্রধান কর্তব্য। যেহেতু এ দেশে বৈবাহিক ধর্ষণ আইনের চোখে অপরাধ নয়। তাই, কোনো বিচার ব্যবস্থা বা সমাজ স্বামী'র দিকে আঙুল তাক করে তাকে ধর্ষক বলে না। স্ত্রী জানে স্বামীকে যদি ছেড়ে যায় সমাজ তাকে চরিত্রহীনা, নষ্ট বলবে হাজার আঙুল তুলে।

অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা, বাবা-মা'কে স্বামীর অত্যাচার, নোংরামীর কথা জানালেও, সমাজ কী বলবে সেই নাক কাটার ভয়ে বাবা-মা সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে অত্যাচারিত নারীকেই উল্টে বলে মানিয়ে গুছিয়ে বাঁচতে, কারণ এটাই ভাগ্য। আবার বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা কাউকে জানায় না। উচ্চশিক্ষিত, স্বনির্ভর নারীও বৈবাহিক ধর্ষণের মতো অপরাধ মানিয়ে গুছিয়ে মুখ বুজে সহ্য করে চলে।

বৈবাহিক ধর্ষণ বা ম্যারিটাল রেপ এর মতো ঘৃণ্য অপরাধ কমাতে গেলে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপক পরিবর্তন করতে হবে। নারী'কে শেখাতে হবে, বিবাহের পরে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ককেও ধর্ষণ বলা হয় এবং এটি তার প্রাপ্য নয়। প্রত্যেক পুরুষের নারীর মানসিক চাহিদাকে গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া আবশ্যক, তবেই সুস্থ সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। বৈবাহিক ধর্ষণকেও আইনি অপরাধের তালিকায় ফেলতে হবে। দিনের পর দিন নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হচ্ছে বহু নারী। কিন্তু, বৈবাহিক ধর্ষণের মতো অপরাধ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের গোড়ায় রয়েছে। হয়তো আমার বাড়িতে, আমার পাশের বাড়িটিতে মুখ বুজে নারীরা ভয়ঙ্করভাবে ধর্ষিত হচ্ছে বছরের পর বছর, অথচ আমি আপনি কেউ জানি না!

424 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।