জাহানুর রহমান খোকন

কবি ও সাংবাদিক কুড়িগ্রাম।

প্রকাশ্যে ধুমপান সমস্যা: বিড়িতে নাকি নারীতে

আমাদের সমাজে নারীর মানুষ হিসাবে কোনো স্বীকৃতি নেই। তার জীবন-মরণ দোদুল্যমান পুরুষের হাতের মুঠোয়। পুরুষশাসিত এই সমাজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সুরে তার দিন-যাপনের তারটি বাঁধা। এমনকি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুহূর্তেও তাকে তাকিয়ে থাকতে হয় পুরুষের মুখের দিকে। সে সিদ্ধান্ত তার বেঁচে থাকা না থাকা সম্পর্কেও হতে পারে। সমাজের যেকোন ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য তাকে হতে হয় কাঠগড়ার আসামী। অথচ এমনটা হবার কথা ছিলো না। মাঝে দুই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাদ দিলে এদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায়নের প্রায় তিন দশক। তাহলে নারী অধিকার তথা নারীর প্রতি বৈষম্যেমূলক হেন অবস্থার কারণ কী?

আইসিডিডিআরবির বাংলাদেশে লিঙ্গীয় পরিচয় (জেন্ডার) এবং নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে পুরুষের মনোভাব ও চর্চা শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের ৮৯ ও শহরের ৮৩ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, স্ত্রী অন্যায় কিছু করলে গায়ে হাত তোলার অধিকার আছে স্বামীর। শহরের ৫০ ও গ্রামের ৬৫ শতাংশ পুরুষ বিশ্বাস করেন, পরিবারকে রক্ষা করার জন্য নারীদের নির্যাতন সহ্য করা উচিত। অথচ জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হয়েছে, 'নারীর প্রতি বৈষ্যমমূলক আচরণ মানব মর্যাদা এবং পরিবার ও সমাজ কল্যাণের পরিপন্থী।'

সম্প্রতি রাজশাহীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার ঐ নারীর ধুমপান করাটা সমস্যা ছিলো নাকি তিনি নারী এটা সমস্যা ছিলো আমার বোধদয় নয়। যদিও প্রকাশ্যে ধুমপান আমি নিজেও সমর্থন করি না।সেটা নারী হোক কিংবা পুরুষ। তবে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হলো লিঙ্গ বৈষম্য। যেখানে চারিদিকে সবাই ধুমপান করতেছে তখন জনে জনে গিয়ে ধুমপান না করার জন্য নিষেধ করা হয় নি। ধুমপান ক্ষতিকর সেটা আমরা সকলে জানি এবং আইনের ভাষায়, খোলা জায়গায়, পার্ক, রেস্তরাঁয়, লঞ্চঘাট,স্টেশনসহ যেখানে লোকসমাগম হয় এরকম জায়গায় ধুমপানে নিষেধ। সেক্ষেত্রে একটি জনসমাগমস্থলে নারীটি ধুমপান করছে তাকে নিষেধ করাই যেতো। নিষেধের ভাষা ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু সেই নিষেধের ভাষাটি যদি হয় তার নারী সত্ত্বার প্রতি আঘাত করে তবে বিষয়টি ভাববার।

ভিডিওটির প্রথমাংশে বলা হচ্ছে, 'শেষে ধর্ষণ হলেতো আমাদেরই দোষ দিবেন।' এইটা দ্বারা বুঝায় নারী কোনো দোষ করলে তাকে ধর্ষিত হতে হবে। নির্যাতনের শিকার হতে হবে। তাকে সকলের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। নারীর সামান্যতম ভুলে পান থেকে চুন খসে পরলেই তাকে দলবদ্ধভাবে হ্যারেস করবার অধিকার যেন এই সমাজ অলিখিত সংবিধান হিসাবে দিয়েছে।অথচ সিগারেট কোম্পানীর সেই সিগারেটের গায়ে তো কখনো লেখা থাকে না শুধুমাত্র পুরুষের জন্য। নাহলে এতো লোকের মাঝে একটি জনসমাগম এলাকায় একজন নারীর ধুমপান নিয়ে যেভাবে হায়েনাদের দলবদ্ধ আক্রমণ আমরা দেখলাম তাতে স্বীকার করতে দোষ নেই। শুধুমাত্র দেশের জনসংখ্যা ছাড়া আর কোথাও পুরুষের সঙ্গে সমানভাবে এগিয়ে যাবার সুযোগ এদেশের মেয়েদের মেলেনি। অথচ কিছুদিন আগেও একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা নির্মূলে সরকার ও প্রশাসন তৎপর ছিলো এবং সফল হন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কোনো ব্যক্তির কোনো বিশেষ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও চিত্র ধারণ করে তার অনুমতি ব্যতীত প্রদর্শন করার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ধারণ করে ধর্ষণের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আক্রমণ করাটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বাহ্যিকরূপ বলে প্রমাণিত হয়।

অর্থনৈতিক সমতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে নারী পুরুষ সমতার সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও এখনো এদেশের নারীর সাফল্যের পথে বাঁধা হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্মকে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করে এদেশের মেয়েদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে।

নারী পুরুষের সঙ্গে দেশের ও জনজীবনের সবর্ত্র সমানাধিকার ভোগ করবে, শাসনতান্ত্রিক এই অধিকার থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নারী এখন ক্রমবর্ধমান ভায়োলেন্সের শিকার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে ভায়ালেন্সের পরিনতি মৃত্যু। সভ্যতার শুরু থেকে নারী নির্যাতন শুরু হয়েছে যা বিংশ শতাব্দীতেও এসে থেমে যায়নি। আদি যুগে শিকারজীবী জীবন থেকে কৃষিজীবী জীবনে প্রবেশের সময় পুরুষ শাসনদন্ড হাতে নিয়ে নেয়। তারপর থেকে যুগে যুগে নারী নির্যাতন চলে আসছে। এ নির্যাতন বাংলাদেশে সবচাইতে বেশী একথা হয়তো বলা যাবে না, কিন্তু অনেক দেশের তুলনায় যথেষ্ট বেশী তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বাংলাদেশের বেশীরভাগ নারী এবং মেয়েরা নানা মাত্রায় লিঙ্গ বৈষ্যমের শিকার। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনের আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে চলতি ২০২০ সালের প্রথম নয় মাসে কমপক্ষে ২৩৫ জন নারীকে তাদের স্বামী বা স্বামীর বাড়ির লোকদের নির্যাতনে প্রাণ দিতে হয়েছে।পাশ্চাত্য দেশে নারী নির্যাতন হয়তো স্বচ্ছল জীবনের বিলাসিতা। অন্যদিকে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন তথা কর্মক্ষেত্রসহ সকল অবস্থানে নারী হ্যারেসমেন্ট পুরুষতান্ত্রিক উগ্র মনোভাবের পরিচায়ক। এদেশে একজন নারী যেমন মানুষ হিসাবে কোনো স্বীকৃতি পায়নি তেমনি পায়নি শ্রমশক্তির স্বীকৃতি। আমাদের সমাজে এরকম অভিযোগও করা হয় নারী কর্মবিমুখ। ঘরের কাজের কোনো বিনিময় মূল্য নেই তাই তাদের কাজকে নন-প্রোডাক্টিভ কাজ হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুল্লাহ ফারুক তাঁর এক সমীক্ষায় ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, 'বাংলাদেশের গ্রামের মেয়েরা প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা উৎপাদনমুখী কাজ করে যেখানে পুরুষরা করে মাত্র ১০ থেকে ১১ ঘন্টা।

এদেশের নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানি বুঝতে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলো একটি অনলাইন জরীপ  করে, তাতে ৭৯ শতাংশ মানুষ অনলাইনে হয়রানির শিকার, যার মধ্যে ৫৩ শতাংশ নারী।

চলতি বছরের ১৬ নভেম্বর পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন নামে একটি ফেসবুক পেজ চালু করা হয়। তার দুইদিনের মধ্যে ৬৯১ টি অভিযোগ জমা পরেছে। পুলিশ সদর দফতরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের তথ্যমতে,সেবা চালুর এক সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজার ৯১৬ জন নারী তাদের সাথে সংঘটিত অপরাধের প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেন। যারা অভিযোগ করেন তারা সবাই কিশোরী ও তরুণী।

প্রতিদিন অসংখ্য মেয়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে,নিহত হচ্ছে, পঙ্গু হয়ে জীবন কাটাচ্ছে, এর অধিকাংশ ঘটনা আমাদের অজানা রয়ে যায়। দু একটি ছিটকে এসে খবরের পাতায় স্থান করে নেয়। চলতি বছরের মাত্র নয় মাসে ২৩৫ জন নারীকে তাদের স্বামীর হাতে অথবা স্বামীর পরিবারের লোকের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিলো। তাদের মধ্যে একজনের বিবাহের বয়স হয়েছিলো মাত্র একমাস। হাতের মেহেদী ও চোখ স্বামী সংসারের স্বপ্ন মিশতে না মিশতেই তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো। যশোরের অভয়নগরের হীরা বেগমের বিয়ে হয়েছিলো বিল্লাল নামের একজনের সাথে, বিয়ের পর থেকেই বিল্লাল হীরাকে নিয়ে ভারতে যেতে চেয়েছিলো। হীরার অপরাধ সে বাবা মাকে ছেড়ে সদ্য বিবাহিত স্বামীর সাথে ভারতে যেতে আপত্তি জানায়। এ নিয়ে প্রায় স্বামী স্ত্রীর কথা-কাটাকাটি হতো। অবশেষে পাষণ্ড স্বামী হীরা বেগমের গায়ে কেরোসিন দিয়ে আগুন লাগিয়ে হত্যা করেন। জামালপুরের মেলনন্দহ উপজেলার মেয়ে দোলনা আক্তার আশুলিয়া একটি পোষাককারখানায় কাজ করতেন। জানা যায় তিন মাস আগে তালাক দেওয়া স্বামী প্রতিশোধ নিতে দোলনার গায়ে অ্যাসিড ছুড়ে মারেন। এভাবেই বিংশ শতাব্দীতে এসেও স্বামী ও স্বামীর বাড়ির লোকদের দ্বারা ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের স্বীকার হয়ে প্রাণ দিচ্ছে বাংলাদেশের নারী এবং এসব ঘটনা থেকে বুঝা যায় যে, একজন পুরুষের কাছে একজন নারী একটি পণ্যমাত্র, যাকে দখলে রাখা না গেলে নিঃশেষ করে ফেলাই পুরুষের কাছে শ্রেয় বলে মনে হয়।

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, পুরুষের সমক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি কখনো পুরুষকে ছোট করে দেখেন নি। তাই তিনি লিখেছিলেন, ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা মূল্য যাহা, আমাদের মূল্য তাহাই।’ তার মতে, প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নারী-পুরুষের সমতা অনস্বীকার্য। সেক্ষেত্রে নারীকে শুধুমাত্র লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্যের মধ্যে ফেলে সমাজের একটি উন্নয়নের চাকা বিকল করে রাখা হচ্ছে। ধর্মের নামে, সমাজ ব্যবস্থার নামে নারীকে বন্দি করে রাখা হচ্ছে। নারীকে মানুষ হিসাবে দেখতে হবে। সেক্ষত্রে পুরুষদের যেমন পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। তেমনি নারীদেরকেও আপন সত্তা ও নারীত্বের স্বকীয়তা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নতুবা শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে ধুমপানের মতো অপরাধে তাকে নারী সত্ত্বার প্রতি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে ক্রমবর্ধমান আক্রমণের শিকার হতেই হবে।

 

506 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।