আরিফা আক্তার

দুই সন্তানের জননী আরিফা পেশাগত জীবনে স্কুল শিক্ষক।

বিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়

বিয়ে অপরিবর্তনীয় কিছু না। যতবেশি যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্ক ভেঙে যাবে, সমাজ ততো বেশি ডিভোর্স সহজভাবে নিতে শিখবে। বাচ্চার মানসিক বিকাশ নিয়ে যারা হাপিত্যেশ করে তাদের জানা দরকার বাবা মায়ের যন্ত্রণাদায়ক জীবন যাপনের চেয়ে সুস্থ পরিবেশে হেসে খেলে বেড়ে উঠা শিশুর জন্য বেশি স্বাস্থ্যসম্মত।

বিয়ে নিয়ে আলগা আদিখ্যেতার কিছু নাই। এটা একটা চুক্তি। ভালোবাসা, সম্মান, মূল্যায়ন থাকলে চুক্তি নবায়ন হবে নইলে ভেঙে যাবে। ব্যাস, কান্নাকাটির কিছু নাই। বিয়েকে মহিমান্বিত করে জীবনকে শেষ করার কোনো মানে হয় না। যাদের ভালো লাগবে তারা বিবাহিত জীবন কন্টিনিউ করবে।

আইনানুগ ভাবে পৃথক হওয়া দোষের নয়। বিয়ে মানে অপরজনকে কিনে নেয়া নয়। সম্মান, মূল্যায়ন না পেলে যেকোনো সময় যে কেউ ছেড়ে যেতে পারে, এই বোধটা বিবাহিতদের মগজে ঢুকাতে পারলে তবেই সঙ্গীর প্রতি যত্নশীল হবে নইলে কেনা সম্পত্তির মতো অযত্নে রেখে দেবে চিরকাল।

সমাজ, সহজে পরিবর্তন মানতে পারে না। দূর্বল মানুষেরা প্রচলিত নিয়মকে আঁকড়ে থাকতে পছন্দ করে। ফলে তারা চায় না কোনো পরিবর্তন আসুক সমাজে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিধিবিধানের হেরফেরে যে ধাক্কা, তা মানা বেশিরভাগ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না।

আমাদের দেশে বিয়েকে ভাবা হয় সারাজীবন একসাথে থাকার দলিল। মানুষ তো কোনো জড় বস্তু নয়, সদা তার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়। শিক্ষা, সচেতনতায় পরিবর্তন হয় মানুষের আবেগ, রুচি। শুধুমাত্র বিয়ের মন্ত্র উচ্চারণ করে দু'জন মানুষের একসাথে থাকার নিশ্চিত ভাবনা বদলানোর সময় এসে গেছে এখন।

বিয়ে প্রথাকে টিকিয়ে রাখার জন্য হরেকরকম বাক্য শোনা যায়। কার্যকরী যে বয়ান, শুধু সেটার অনুপস্থিতি রয়ে যায়। সন্তান বা সংস্কারের দোহাই দিয়ে বিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হলো সর্বোত্তম বোকামি। সচেতন মানুষেরা সংস্কার ভেঙে সংস্কৃতি তৈরি করে, সন্তানকে ভালোবেসে বিষাক্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসে।

হাহুতাশ না করে আমাদের সিরিয়াসলি ভেবে দেখার দরকার কেনো এই বিচ্ছেদের হার বেড়ে গেলো? বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স না চাইলে করনীয় কী? সবার আগে যে জিনিসটা প্রয়োজন তা হলো বিয়েকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত না ভাবা। বিয়েকে যতবেশি সহজ ভাবতে শিখবো আমরা ততোবেশি দাম্পত্য টেকসই হবে।

বিয়ে মানে দু'জন মানুষের মৌলিক চাহিদা গুলো একসঙ্গে পূরণের একটা চুক্তি। জীবনের নানাদিক একসাথে মোকাবেলা করার আনন্দময় যাত্রা। এখানে একজন আরেকজনের অধীনস্থ না থাকার বা না রাখার প্রত্যয় নিয়ে জীবন শুরু করা উচিৎ। উচিত একে অপরকে শ্রদ্ধা করার মনোভাব বজায় রাখা।

প্রতিটি মানুষ আলাদা, তার শিক্ষা, রুচি, বেড়ে উঠার পরিবেশ আলাদা। সুতরাং তাদের বোধ বুদ্ধি ভিন্ন রকমের হবে এটাই স্বাভাবিক। অপরের স্বাভাবিকতা মেনে নিয়ে সম্মান দেখিয়ে জীবন কাটানোর চিন্তা মাথায় না রাখলে বিয়ে দিনকে দিন ভঙ্গুর হতে থাকবে।

সাম্প্রতিক কালের বিয়ে বিচ্ছেদের যে পরিসংখ্যান তাতে খেয়াল করলে দেখা যায় নারী পুরুষের ডিভোর্স এর কারণ ভিন্ন। নারী বেশিরভাগ সময় শারীরিক বা মানসিক বা উভয় নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে ডিভোর্স নেয়। অন্যদিকে পুরুষ আধিপত্য কায়েম করতে না পারার মতো অমানবিক যুক্তি দেখিয়ে ডিভোর্স নেয়। বিচ্ছেদের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেই বিয়ে প্রথার ভিতরের কদর্যরূপ বের হয়ে আসে। যেখানে উচিৎ মমত্ববোধ নিয়ে দু'জন মানুষের পথ চলা, সেখানে ঢুকে গেছে নির্যাতন।

ঐযে, যখনই কোনোকিছু চিরস্থায়ী নিজের বলে মনে করি আমরা তখনই শুরু হয় চেতন অবচেতনে অবহেলা বা অবমূল্যায়ন। এখানেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। বিয়েকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য উভয়ের যত্নশীল হতে হবে। অযত্নে রেখে বিচ্ছেদ ঘটলে হাহাকার করার মানসিকতা পরিবর্তন দরকার। সঙ্গীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে, সযত্নে গড়ে উঠুক প্রতিটি দাম্পত্য, নচেৎ বিচ্ছেদে মুক্তি ঘটুক জীবনের- এই হোক বিয়ের মূলমন্ত্র।

595 times read

নারী'তে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত নারী'র সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় নারী কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়। নারীতে প্রকাশিত কোনো লেখা বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রকাশ কপিরাইট আইনের লংঘন বলে গণ্য হবে।